সংবাদ শিরোনাম :
Logo ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান Logo স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি : তথ্যমন্ত্রী Logo নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬-এর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী Logo কালবৈশাখী ও ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা জারি, চট্টগ্রামে ভূমিধসের আশঙ্কা Logo ঢাকায় কাল থেকে জেলা প্রশাসক সম্মেলন, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী Logo ঈশ্বরদীর বাজারে উঠেছে অপরিপক্ব স্বাদহীন দেশী লিচু, বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে Logo ডিমলায় ২৫কেজি গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার Logo রূপপুর প্রকল্পে রুশ নাগরিকের মৃত্যু Logo চট্টগ্রামে নানা কর্মসূচিতে মে দিবস পালিত Logo চাঁদপুরে নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরতে নেমেছেন জেলেরা

‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে বহিষ্কার, ঘটেছিল কি?

সারাবেলা প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১০:৪২:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬ ১২ বার পঠিত

‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের ‘বিক্ষোভের জেরে’ দুই শিক্ষককে বহিষ্কার করার পর একদিনের মাথায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) কর্তৃপক্ষ।

সোমবার বিকাল ৩টা নাগাদ একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ও শিক্ষার্থীদেরকে মেইল করে এই তথ্য জানানো হয়।

গতকাল রোববার, ১৮ই জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সন্ধ্যার পরে ওই শিক্ষকদের বহিষ্কারের ঘোষণা করা হয়েছিল। বহিষ্কৃত হওয়াদের একজন হলেন ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর। আরেকজন ওই একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. মহসিন।

বহিষ্কৃত দুই শিক্ষকের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নিপীড়নমূলক আচরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটাও দেওয়া হয়নি।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে ওই শিক্ষকদের এখন বহিষ্কার করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে অনেক ‘আগে থেকেই’ অভিযোগ রয়েছে।

১৮ই জানুয়ারি তারিখে প্রকাশিত জরুরি বিজ্ঞপ্তি

কী ঘটেছিলো?

যে ঘটনার জেরে অনির্ষ্টকালের জন্য ঢাকার এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধের সিদ্ধান্ত এসেছে, সেই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গতকাল এলেও মূল ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে।

কী হয়েছিলো? জানতে অভিযুক্ত লায়েকা বশীর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, এমনকি যারা গতকাল পক্ষে-বিপক্ষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তাদের সবার সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

বিক্ষোভকারী ও অভিযুক্ত, দুই পক্ষের বক্তব্যেই এটি পরিষ্কার যে, বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১০ই ডিসেম্বর একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে।

সেখানে শিক্ষক লায়েকা বশীর লিখেছিলেন, তিনি সমস্ত মুখমণ্ডল ঢেকে পর্দা করার বিপক্ষে।

তার ভাষায়, “সারা শরীর ঢাকেন, হাত-মোজা, পা-মোজা পরেন, সমস্যা নাই। কিন্তু মুখমণ্ডল দেখাতেই হবে। ধর্মেও, যতদূর জানি, সারা মুখ মমি বানিয়ে রাখতে বলা হয়নি।”

“আজকাল ইউনিভার্সিটির ক্লাসে অনেক নারী-শিক্ষার্থী মুখ ঢেকে বসে থাকে। এটাকে আমার কাছে অভদ্রতা বলেই মনে হয়,” তিনি আরও যোগ করেন।

তার বিশ্বাস, এই মুখ-ঢাকার সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।

মিজ বশীর ওই পোস্টটির প্রাইভেসি সেটিংস শুধু ‘ফ্রেন্ডস’ করা থাকলেও কোনো না কোনোভাবে সেই পোস্টের স্ক্রিনশট খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউএপির অনেক শিক্ষার্থী আসল বা নকল ফেসবুক আইডি থেকে তার “ইনবক্সে-কমেন্টে গালমন্দ করা, হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করে।

পরে আমি বাধ্য হয়ে ও পোস্ট অনলি মি করে দেই,” বলেন তিনি।

মিজ বশীর তার সেই পোস্টের একটি স্ক্রিনশট গণমাধ্যমকে দেন। পোস্টের শেষে লেখা ছিল, সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরে জোড়া খুনের ঘটনার প্রেক্ষাপটেই তিনি লেখাটি লিখেছেন।

কিন্তু অপরিচিত অনেক ফেসবুক আইডি থেকে ক্রমাগত গালাগাল, আক্রমণ, হুমকি আসতে থাকায় সাতদিনের মাথায় ১৭ই ডিসেম্বর একই বিষয়ে আবার একটি পোস্ট করেন এবং তার কথায় কেউ আঘাত পেলে ক্ষমা চান ওই পোস্টটির মধ্য দিয়ে। তিনি এও বলেন, তিনি যা লিখেছেন তা তার ব্যক্তিগত মতামত এবং সে বিষয়ে ইউএপি’র কোনও সম্পর্ক নেই।

অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) কর্তৃপক্ষ

“এরপরও ইউএপি’র প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও পেইজ আছে, তাতে তুমুল লেখালেখি শুরু করা হয় আমার নামে। আমার নামে ফটোকার্ড বানানো হয়। বাজেভাবে উপস্থাপন করা হয় আমায়। বলা হয়, আমি ক্লাসে ধর্মবিশ্বেষ ছড়াই, কোন মেয়েকে মুখের আবরণ সরাতে বাধ্য করেছি… এরপর ভিসি একদিন ফোন করে বলে, রিজাইন করতে।”

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৭ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন জানিয়ে বলেন, তিনি ভিসি’র কথা শুনে পদত্যাগ করেননি। বরং, ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিনস, প্রক্টর, বোর্ড অফ ট্রাস্টিজের চেয়ারপার্সনসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতনদের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সময় চান।

“সেদিন আমি পরিষ্কার করে বলি, এই পরিস্থিতিতে আমাকে আপনাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, তা না করে আপনারা আমার পদত্যাগ চাইছেন… এদিকে এরপর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সেই কমিটির তদন্ত এখনও চলমান। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আমায় বহিষ্কার করে।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে গতকালের পরিস্থিতি অনেকটা দায়ী।

কারণ গতকাল নতুন সেমেস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থী বা প্রাক্তন শিক্ষার্থী নামের একটি গ্রুপ আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল যে মিজ বশীর ক্লাস নিলে তারা দেখে নেবে।

“ওরা বিশাল মব ফর্ম করে। সাউন্ড স্পিকার আনে। প্রেস কনফারেন্স করে। পরে সন্ধ্যার দিকে অবস্থান ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন রাত ৮টার দিকে প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর ঘোষণা দেয় টার্মিনেট করা হলো…ওদের অন্য ইস্যুও ছিল। কিন্তু আমারটা সামনে আনলো। ওদের বক্তব্য, আমাকে দূর করলে ইউনিভার্সিটি ইসলামবিদ্বেষী রূপ থেকে মুক্ত হবে,” বলেন মিজ বশীর।

এখানে উল্লেখ্য, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই সাধারণত সেমেস্টার শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদেরকে মূল্যায়ন করতে পারে।

একই নিয়মে সেই সেমেস্টারে মিজ বশীরেরও মূল্যায়ন হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে “লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আছে, তা জানানোর জন্য আলাদা একটি গুগল ফর্ম শিক্ষার্থীদের মেইলে পাঠানো হয় সম্প্রতি”, বলছিলেন লায়েকা বশীর নিজে, তার শিক্ষার্থীরা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও।

গতকাল ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) বিক্ষোভ

শিক্ষার্থীরা যা বলছে

গতকাল ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) যে বিক্ষোভ হয়েছে, তার অন্যতম মুখপাত্র ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জামশেদ কুতুব পাশা।

তিনি বিবিসিকে বলেন, তার কোনও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়ে বিক্ষোভে সম্মুখ সারিতে ছিলেন জানিয়ে বলেন, “লায়েকা বশীরকে বহিষ্কারের পেছনে ইসলামোফোবিয়া ইস্যু আছে। সেটার রেষ ধরে এবং ক্যাম্পাসের ইন্টার্নাল কিছু বিষয় নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। মূল বিষয় হলো, লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ, নিকাব পরে এমন মেয়েদের কটাক্ষ করে উনি পোস্ট দিয়ে বলেছেন, এটি অপরাধপ্রবণতা বাড়াবে।”

তার দাবি, ওই পোস্টের পর থেকেই অনেক নারী শিক্ষার্থী বলে যে “লায়েকা বশীর ম্যামের এই ধরনের কথা এখনকার না। তারা আগে থেকেই ফেস করছে। আমাদের প্রমাণও আছে।”

এছাড়া, “কোরবানি নিয়ে সেক্যুলাররা অন্যরকম কথাবার্তা বলে সবসময়। উনিও এই টাইপের কথাবার্তা বলতে চায় যে এটা নাকি উল্লাসে পশু হত্যা। উনি ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে কটূক্তি করতেন। সো, ওনার ওই পোস্টের পর ভিক্টিমরা কথাবার্তা বলতে শুরু করছেন।”

এদিকে, লায়েকা বশীরের সাথে বহিষ্কৃত আরেক শিক্ষকের বিষয়ের আপত্তির জায়গা কোথায়?

জানতে চাইলে এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, “ওনারও ইসলামোফোবিয়া আছে। তবে ওনার মূল বিষয় আ’লীগ সম্পৃক্ততা। উনি সাম্প্রতিক সময়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের শাটডাউন টাইপ ফেসবুক পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিছে। আমরা সেগুলো রেকর্ড করে রাখছি। “

এছাড়া, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলা আয়োজন করা হয়। সেখানে এ. এস. এম. মহসিন ‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস’ নামক একটি বই রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীদেরকে বলেছিলেন, “এই বই এখান থেকে সরবে না।”

গত বছর জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপি গোপালগঞ্জে যাওয়ার পর যে হামলা হয় এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে, তা নিয়েও “স্যার ফেসবুকে দুঃখ প্রকাশ করলো যে গোপালগঞ্জের এই হতাহত অবস্থা তিনি মানতে পারতেছেন না। তাই, ওনার ক্ষেত্রে এগুলোই মূল।”

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ততা থাকার জন্য ভিসিরও পদত্যাগ চেয়েছেন তারা।

এদিকে, যারা ওই দুই শিক্ষকের বহিষ্কারের বিপক্ষে, সেরকম একাধিক বর্তমান শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছে গণমাধ্যম। কিন্তু তারা কেউ-ই নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নয়।

এরকমই একজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “পাঁচই অগাস্টের পরই ক্যাম্পাসে রিফর্মের বিক্ষোভ হয়। অনেকে দাবি-দাওয়া পেশ করে, ভিসির পদত্যাগ চায়। পরবর্তীতে একটা গ্রুপ ক্যাম্পেইন চালায়, লায়েকা বশীর ইসলাম বিদ্বেষী ও শাহবাগী, নাস্তিক ট্যাগ দেয় তাকে। তাকে নানাভাবে থ্রেট দেওয়া হচ্ছিলো। এরপর গত কাল ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করে, মব ক্রিয়েট করে।”

এই শিক্ষার্থী বলেন, যারা বিক্ষোভে উপস্থিত ছিল, তাদের মাঝে সাধারণ শিক্ষার্থী কম। যারা ছিল, তাদের বেশিরভাগই প্রাক্তন এবং “পলিটিক্যালি মোটিভেটেড গ্রুপ। শিবির বা হিযবুত তাহেরীর মতো গ্রুপ ছিল। ওরা এর আগেও ইউনিভার্সিটিতে এরকম প্রোগ্রাম করেছে।”

আরেক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা চাই এর সুস্থ তদন্ত হোক। এই অশান্তির নিরসন হোক। এইসব অভিযোগ কিন্তু এসেছে পাঁচই অগাস্টের পর থেকে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে ‘নিন্দাজ্ঞাপন’

বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, যিনি ইংরেজি বিভাগের প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক তাকাদ আহমেদ চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিবিসিকে বলেন, “আপনারা হয়তো বুঝতে পারেন, কালকে (১৮ই জানুয়ারি) শিক্ষার্থীদের ডিমান্ড…অনেক দিন ধরেই এই ডিমান্ড, গতকাল তা শুধু ব্যাপকতা পেয়েছে বেশি এবং শেষ পর্যন্ত জিনিসটা ওই জায়গায় গেছে।”

তাহলে কি শিক্ষার্থীদের ‘চাপের মুখে পড়ে’ বিশ্ববিদ্যালয় বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

এই প্রশ্ন করলে তার উত্তরে তিনি বলেন, “চাপেই নতি স্বীকার, বিষয়টা তা না… এর আগের কিছু ঘটনা ছিল এবং এটার একটা ব্যবস্থা করার প্রসেসে বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই ছিল।”

তিনিও বলেন যে আগে লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে কিছু কিছু মৌখিক অভিযোগ ও তার স্বপক্ষে প্রমাণ থাকলেও এই প্রথম লিখিতভাগে অভিযোগ এসেছে এবং অভিযোগের পর “বিশ্ববিদ্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলো এবং সেই কমিটি যথাযথভাবে কাজও করছিল। কিন্তু গতকাল পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”

তদন্ত শেষের আগে নেওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এই মুহূর্তে ভারপ্রাপ্ত, আমি ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারবো না।”

এই ঘটনা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, ”এটা ঠিক যে কমিটি কাজ করছিল। আগামীকাল রিপোর্ট জমা দিবে। সেন্সিটিভ ইস্যুতে আগে থেকেই ঝামেলা চলছিলো। আর কমিটির চারজনই আমরা এখানকার টিচার। অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। তাই পরিস্থিতির কারণে এটা আগেই দিয়েছি”।

”আমাদের সার্ভিস ম্যানুয়ালের ক্লজ আছে। ওই অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটা আমার সার্ভিস ম্যানুয়ালের পার্ট। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারেও ওই ক্লজ উল্লেখ ছিল। সেটা ব্যবহার করেই আমরা ব্যবস্থাটা নিয়েছি”, বলেছেন অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া।

গতকাল ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) বিক্ষোভ

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তকে “অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, ইউএপি চাইলে এটাকে আগেই সমাধান করতে পারতো” বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা।

তিনি মনে করেন, “যে উপায়ে এই পুরো কেসটা হ্যান্ডেল করেছে, এটা যেকোনও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য একটি ভয়ংকর ব্যাপার। ওনারা তদন্ত কমিটি সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে একজ্ন শিক্ষকের সমস্ত অধিকারকে ভায়োলেশন করেছেন। কমিটি গঠন করে ওপেন অভিযোগ আহ্বান করা হয়েছে। অথচ হওয়ার কথা তদন্ত, ফ্যাক্ট ফাইন্ডং, চার্জ।”

এই শিক্ষকের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একই জিনিস চর্চার চেষ্টা করে পুরোপুরি সুবিধা করা যায়নি। কিন্তু এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চেষ্টা করা হচ্ছে। “যারা ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তারা এটিকে ব্যবহার করছে।”

এ প্রসঙ্গে লায়েকা বশীরও বলেছিলেন, “আমি এমন কিছু করিনি, যার জন্য আমার সাথে এটা করতে পারেন। তদন্ত চলছে, কমিটি সৃষ্টি হয়েছে। এর মাঝখানে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা আইন ভঙ্গ করেছেন। এ‌টা উদাহরণ সৃষ্টি হলে এর পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও এগুলো ঘটবে।”

এদিকে, আজ ‘দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দঙ্গলবাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার নিন্দা ও প্রতিবাদ’ শীর্ষক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। বিবিসি

Facebook Comments Box
শেয়ার করুন:
ট্যাগস :

‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে বহিষ্কার, ঘটেছিল কি?

আপডেট সময় : ১০:৪২:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের ‘বিক্ষোভের জেরে’ দুই শিক্ষককে বহিষ্কার করার পর একদিনের মাথায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) কর্তৃপক্ষ।

সোমবার বিকাল ৩টা নাগাদ একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে ও শিক্ষার্থীদেরকে মেইল করে এই তথ্য জানানো হয়।

গতকাল রোববার, ১৮ই জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সন্ধ্যার পরে ওই শিক্ষকদের বহিষ্কারের ঘোষণা করা হয়েছিল। বহিষ্কৃত হওয়াদের একজন হলেন ব্যাসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর। আরেকজন ওই একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. মহসিন।

বহিষ্কৃত দুই শিক্ষকের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নিপীড়নমূলক আচরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং তাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটাও দেওয়া হয়নি।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে ওই শিক্ষকদের এখন বহিষ্কার করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে অনেক ‘আগে থেকেই’ অভিযোগ রয়েছে।

১৮ই জানুয়ারি তারিখে প্রকাশিত জরুরি বিজ্ঞপ্তি

কী ঘটেছিলো?

যে ঘটনার জেরে অনির্ষ্টকালের জন্য ঢাকার এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধের সিদ্ধান্ত এসেছে, সেই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গতকাল এলেও মূল ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে।

কী হয়েছিলো? জানতে অভিযুক্ত লায়েকা বশীর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, এমনকি যারা গতকাল পক্ষে-বিপক্ষে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, তাদের সবার সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

বিক্ষোভকারী ও অভিযুক্ত, দুই পক্ষের বক্তব্যেই এটি পরিষ্কার যে, বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১০ই ডিসেম্বর একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে।

সেখানে শিক্ষক লায়েকা বশীর লিখেছিলেন, তিনি সমস্ত মুখমণ্ডল ঢেকে পর্দা করার বিপক্ষে।

তার ভাষায়, “সারা শরীর ঢাকেন, হাত-মোজা, পা-মোজা পরেন, সমস্যা নাই। কিন্তু মুখমণ্ডল দেখাতেই হবে। ধর্মেও, যতদূর জানি, সারা মুখ মমি বানিয়ে রাখতে বলা হয়নি।”

“আজকাল ইউনিভার্সিটির ক্লাসে অনেক নারী-শিক্ষার্থী মুখ ঢেকে বসে থাকে। এটাকে আমার কাছে অভদ্রতা বলেই মনে হয়,” তিনি আরও যোগ করেন।

তার বিশ্বাস, এই মুখ-ঢাকার সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে সমাজে অপরাধের মাত্রা বাড়াবে।

মিজ বশীর ওই পোস্টটির প্রাইভেসি সেটিংস শুধু ‘ফ্রেন্ডস’ করা থাকলেও কোনো না কোনোভাবে সেই পোস্টের স্ক্রিনশট খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউএপির অনেক শিক্ষার্থী আসল বা নকল ফেসবুক আইডি থেকে তার “ইনবক্সে-কমেন্টে গালমন্দ করা, হুমকি-ধমকি দেওয়া শুরু করে।

পরে আমি বাধ্য হয়ে ও পোস্ট অনলি মি করে দেই,” বলেন তিনি।

মিজ বশীর তার সেই পোস্টের একটি স্ক্রিনশট গণমাধ্যমকে দেন। পোস্টের শেষে লেখা ছিল, সম্প্রতি ঢাকার মোহাম্মদপুরে জোড়া খুনের ঘটনার প্রেক্ষাপটেই তিনি লেখাটি লিখেছেন।

কিন্তু অপরিচিত অনেক ফেসবুক আইডি থেকে ক্রমাগত গালাগাল, আক্রমণ, হুমকি আসতে থাকায় সাতদিনের মাথায় ১৭ই ডিসেম্বর একই বিষয়ে আবার একটি পোস্ট করেন এবং তার কথায় কেউ আঘাত পেলে ক্ষমা চান ওই পোস্টটির মধ্য দিয়ে। তিনি এও বলেন, তিনি যা লিখেছেন তা তার ব্যক্তিগত মতামত এবং সে বিষয়ে ইউএপি’র কোনও সম্পর্ক নেই।

অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) কর্তৃপক্ষ

“এরপরও ইউএপি’র প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের যেসব ফেসবুক গ্রুপ ও পেইজ আছে, তাতে তুমুল লেখালেখি শুরু করা হয় আমার নামে। আমার নামে ফটোকার্ড বানানো হয়। বাজেভাবে উপস্থাপন করা হয় আমায়। বলা হয়, আমি ক্লাসে ধর্মবিশ্বেষ ছড়াই, কোন মেয়েকে মুখের আবরণ সরাতে বাধ্য করেছি… এরপর ভিসি একদিন ফোন করে বলে, রিজাইন করতে।”

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৭ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন জানিয়ে বলেন, তিনি ভিসি’র কথা শুনে পদত্যাগ করেননি। বরং, ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিনস, প্রক্টর, বোর্ড অফ ট্রাস্টিজের চেয়ারপার্সনসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতনদের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সময় চান।

“সেদিন আমি পরিষ্কার করে বলি, এই পরিস্থিতিতে আমাকে আপনাদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা, তা না করে আপনারা আমার পদত্যাগ চাইছেন… এদিকে এরপর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সেই কমিটির তদন্ত এখনও চলমান। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আমায় বহিষ্কার করে।”

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে গতকালের পরিস্থিতি অনেকটা দায়ী।

কারণ গতকাল নতুন সেমেস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থী বা প্রাক্তন শিক্ষার্থী নামের একটি গ্রুপ আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল যে মিজ বশীর ক্লাস নিলে তারা দেখে নেবে।

“ওরা বিশাল মব ফর্ম করে। সাউন্ড স্পিকার আনে। প্রেস কনফারেন্স করে। পরে সন্ধ্যার দিকে অবস্থান ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন রাত ৮টার দিকে প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর ঘোষণা দেয় টার্মিনেট করা হলো…ওদের অন্য ইস্যুও ছিল। কিন্তু আমারটা সামনে আনলো। ওদের বক্তব্য, আমাকে দূর করলে ইউনিভার্সিটি ইসলামবিদ্বেষী রূপ থেকে মুক্ত হবে,” বলেন মিজ বশীর।

এখানে উল্লেখ্য, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই সাধারণত সেমেস্টার শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদেরকে মূল্যায়ন করতে পারে।

একই নিয়মে সেই সেমেস্টারে মিজ বশীরেরও মূল্যায়ন হয়েছে। কিন্তু এর বাইরে “লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আছে, তা জানানোর জন্য আলাদা একটি গুগল ফর্ম শিক্ষার্থীদের মেইলে পাঠানো হয় সম্প্রতি”, বলছিলেন লায়েকা বশীর নিজে, তার শিক্ষার্থীরা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও।

গতকাল ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) বিক্ষোভ

শিক্ষার্থীরা যা বলছে

গতকাল ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) যে বিক্ষোভ হয়েছে, তার অন্যতম মুখপাত্র ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জামশেদ কুতুব পাশা।

তিনি বিবিসিকে বলেন, তার কোনও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়ে বিক্ষোভে সম্মুখ সারিতে ছিলেন জানিয়ে বলেন, “লায়েকা বশীরকে বহিষ্কারের পেছনে ইসলামোফোবিয়া ইস্যু আছে। সেটার রেষ ধরে এবং ক্যাম্পাসের ইন্টার্নাল কিছু বিষয় নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। মূল বিষয় হলো, লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ, নিকাব পরে এমন মেয়েদের কটাক্ষ করে উনি পোস্ট দিয়ে বলেছেন, এটি অপরাধপ্রবণতা বাড়াবে।”

তার দাবি, ওই পোস্টের পর থেকেই অনেক নারী শিক্ষার্থী বলে যে “লায়েকা বশীর ম্যামের এই ধরনের কথা এখনকার না। তারা আগে থেকেই ফেস করছে। আমাদের প্রমাণও আছে।”

এছাড়া, “কোরবানি নিয়ে সেক্যুলাররা অন্যরকম কথাবার্তা বলে সবসময়। উনিও এই টাইপের কথাবার্তা বলতে চায় যে এটা নাকি উল্লাসে পশু হত্যা। উনি ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে কটূক্তি করতেন। সো, ওনার ওই পোস্টের পর ভিক্টিমরা কথাবার্তা বলতে শুরু করছেন।”

এদিকে, লায়েকা বশীরের সাথে বহিষ্কৃত আরেক শিক্ষকের বিষয়ের আপত্তির জায়গা কোথায়?

জানতে চাইলে এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলেন, “ওনারও ইসলামোফোবিয়া আছে। তবে ওনার মূল বিষয় আ’লীগ সম্পৃক্ততা। উনি সাম্প্রতিক সময়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের শাটডাউন টাইপ ফেসবুক পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিছে। আমরা সেগুলো রেকর্ড করে রাখছি। “

এছাড়া, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলা আয়োজন করা হয়। সেখানে এ. এস. এম. মহসিন ‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস’ নামক একটি বই রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীদেরকে বলেছিলেন, “এই বই এখান থেকে সরবে না।”

গত বছর জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপি গোপালগঞ্জে যাওয়ার পর যে হামলা হয় এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে, তা নিয়েও “স্যার ফেসবুকে দুঃখ প্রকাশ করলো যে গোপালগঞ্জের এই হতাহত অবস্থা তিনি মানতে পারতেছেন না। তাই, ওনার ক্ষেত্রে এগুলোই মূল।”

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ততা থাকার জন্য ভিসিরও পদত্যাগ চেয়েছেন তারা।

এদিকে, যারা ওই দুই শিক্ষকের বহিষ্কারের বিপক্ষে, সেরকম একাধিক বর্তমান শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছে গণমাধ্যম। কিন্তু তারা কেউ-ই নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নয়।

এরকমই একজন শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “পাঁচই অগাস্টের পরই ক্যাম্পাসে রিফর্মের বিক্ষোভ হয়। অনেকে দাবি-দাওয়া পেশ করে, ভিসির পদত্যাগ চায়। পরবর্তীতে একটা গ্রুপ ক্যাম্পেইন চালায়, লায়েকা বশীর ইসলাম বিদ্বেষী ও শাহবাগী, নাস্তিক ট্যাগ দেয় তাকে। তাকে নানাভাবে থ্রেট দেওয়া হচ্ছিলো। এরপর গত কাল ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করে, মব ক্রিয়েট করে।”

এই শিক্ষার্থী বলেন, যারা বিক্ষোভে উপস্থিত ছিল, তাদের মাঝে সাধারণ শিক্ষার্থী কম। যারা ছিল, তাদের বেশিরভাগই প্রাক্তন এবং “পলিটিক্যালি মোটিভেটেড গ্রুপ। শিবির বা হিযবুত তাহেরীর মতো গ্রুপ ছিল। ওরা এর আগেও ইউনিভার্সিটিতে এরকম প্রোগ্রাম করেছে।”

আরেক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা চাই এর সুস্থ তদন্ত হোক। এই অশান্তির নিরসন হোক। এইসব অভিযোগ কিন্তু এসেছে পাঁচই অগাস্টের পর থেকে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে ‘নিন্দাজ্ঞাপন’

বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, যিনি ইংরেজি বিভাগের প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক তাকাদ আহমেদ চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিবিসিকে বলেন, “আপনারা হয়তো বুঝতে পারেন, কালকে (১৮ই জানুয়ারি) শিক্ষার্থীদের ডিমান্ড…অনেক দিন ধরেই এই ডিমান্ড, গতকাল তা শুধু ব্যাপকতা পেয়েছে বেশি এবং শেষ পর্যন্ত জিনিসটা ওই জায়গায় গেছে।”

তাহলে কি শিক্ষার্থীদের ‘চাপের মুখে পড়ে’ বিশ্ববিদ্যালয় বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

এই প্রশ্ন করলে তার উত্তরে তিনি বলেন, “চাপেই নতি স্বীকার, বিষয়টা তা না… এর আগের কিছু ঘটনা ছিল এবং এটার একটা ব্যবস্থা করার প্রসেসে বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই ছিল।”

তিনিও বলেন যে আগে লায়েকা বশীরের বিরুদ্ধে কিছু কিছু মৌখিক অভিযোগ ও তার স্বপক্ষে প্রমাণ থাকলেও এই প্রথম লিখিতভাগে অভিযোগ এসেছে এবং অভিযোগের পর “বিশ্ববিদ্যালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলো এবং সেই কমিটি যথাযথভাবে কাজও করছিল। কিন্তু গতকাল পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”

তদন্ত শেষের আগে নেওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এই মুহূর্তে ভারপ্রাপ্ত, আমি ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারবো না।”

এই ঘটনা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, ”এটা ঠিক যে কমিটি কাজ করছিল। আগামীকাল রিপোর্ট জমা দিবে। সেন্সিটিভ ইস্যুতে আগে থেকেই ঝামেলা চলছিলো। আর কমিটির চারজনই আমরা এখানকার টিচার। অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। তাই পরিস্থিতির কারণে এটা আগেই দিয়েছি”।

”আমাদের সার্ভিস ম্যানুয়ালের ক্লজ আছে। ওই অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটা আমার সার্ভিস ম্যানুয়ালের পার্ট। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারেও ওই ক্লজ উল্লেখ ছিল। সেটা ব্যবহার করেই আমরা ব্যবস্থাটা নিয়েছি”, বলেছেন অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া।

গতকাল ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) বিক্ষোভ

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তকে “অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক, ইউএপি চাইলে এটাকে আগেই সমাধান করতে পারতো” বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা।

তিনি মনে করেন, “যে উপায়ে এই পুরো কেসটা হ্যান্ডেল করেছে, এটা যেকোনও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য একটি ভয়ংকর ব্যাপার। ওনারা তদন্ত কমিটি সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে একজ্ন শিক্ষকের সমস্ত অধিকারকে ভায়োলেশন করেছেন। কমিটি গঠন করে ওপেন অভিযোগ আহ্বান করা হয়েছে। অথচ হওয়ার কথা তদন্ত, ফ্যাক্ট ফাইন্ডং, চার্জ।”

এই শিক্ষকের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একই জিনিস চর্চার চেষ্টা করে পুরোপুরি সুবিধা করা যায়নি। কিন্তু এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চেষ্টা করা হচ্ছে। “যারা ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তারা এটিকে ব্যবহার করছে।”

এ প্রসঙ্গে লায়েকা বশীরও বলেছিলেন, “আমি এমন কিছু করিনি, যার জন্য আমার সাথে এটা করতে পারেন। তদন্ত চলছে, কমিটি সৃষ্টি হয়েছে। এর মাঝখানে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা আইন ভঙ্গ করেছেন। এ‌টা উদাহরণ সৃষ্টি হলে এর পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও এগুলো ঘটবে।”

এদিকে, আজ ‘দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দঙ্গলবাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার নিন্দা ও প্রতিবাদ’ শীর্ষক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। বিবিসি

Facebook Comments Box
শেয়ার করুন: