আধুনিক যুগেও ধান কেটে সারিবদ্ধ ঘোড়ার গাড়িতে বাড়ি ফিরছেন কৃষি শ্রমিকরা
- আপডেট সময় : ০৭:৩৭:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬ ১২৯ বার পঠিত

এক সময়ের যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের মাধ্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি। যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলা থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সাত সকালে পাবনার ঈশ্বরদী শহরের আলহাজ মোড়ে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো ২০ থেকে ২৫টি ঘোড়ার গাড়ি দেখে থমকে দাঁড়ান পথচারীরা। আধুনিকতার যুগে এক সঙ্গে এতোগুলো ঘোড়ার গাড়ির বহর দেখে উৎসুক সাধারণ মানুষ ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ কৌতূহল ও আনন্দ তৈরি হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ঘোষপুর এবং ২ নং ঈশ্বরদী ইউনিয়নের পুরাতন ঈশ্বরদী গ্রাম থেকে প্রতি বছর বোরো মৌসুমে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের (মলা) কাজের জন্য কৃষি শ্রমিকরা ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে নাটোরের আত্রায় ও মাধনগর এলাকায় যান। দীর্ঘ প্রায় ১ মাস আত্রায় ও মাধনগর এলাকায় বিভিন্ন মাঠে কাজ শেষে বৃহস্পতিবার সকালে তাঁরা নিজ এলাকায় ফিরে আসছিলেন। পথে ঘোড়াগুলোকে খাওয়ানো এবং চালকদের নিজেদের সকালের বিশ্রামের জন্য তাঁরা ঈশ্বরদীর আলহাজ মোড়ে রাস্তার পাশে কিছুক্ষণ যাত্রাবিরতি করেন।
সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে এই দৃশ্য দেখে সাজিদ নামের এক স্থানীয় শিক্ষার্থী জানায়, আমি এভাবে কখনো একসঙ্গে এতোগুলো ঘোড়ার গাড়ি দেখিনি। সাত সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তার ধারে এই চমৎকার দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে উপভোগ করলাম। আমার দেখাদেখি আরও অনেক শিক্ষার্থী সেখানে এসে ভিড় জমায়। গাড়ির চালকেরা ঘোড়াগুলোকে খড়-কুটো খাওয়াচ্ছিলেন।
সকালে হাঁটতে বের হওয়া স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় করে হাঁটতে বের হই। আজ ফেরার পথে আলহাজ মোড়ে এসে চোখ আটকে গেল। আমাদের এই অঞ্চলে এক সময় যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যমই ছিল ঘোড়ার গাড়ি। আধুনিক যানবাহনের কারণে কালের গর্ভে তা হারিয়ে গেছে। আজ এক সঙ্গে এতোগুলো গাড়ি দেখে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল, বেশ ভালো লেগেছে।
ঘোড়ার গাড়ি চালক আবেদ আলী জানান, বছরের অন্য সময়ে তাঁরা এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে মূলত বিভিন্ন ইটের ভাটায় মাটি ও ইট বহনের কাজ করে থাকেন। তবে বর্ষা মৌসুম চলে আসলে এলাকায় এই ধরনের কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অলস সময়ে সংসারের খরচ চালাতে ও ঘোড়াগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর এই সময়ে তাঁরা নাটোরের আত্রায় ও মাধনগর এলাকায় ধান কাটার মৌসুমে চলে যান।
আবেদ আলী বলেন, প্রায় এক মাস আগে আমরা দলবেঁধে বাড়ি থেকে বের হয়ে আত্রাইয়ে গিয়েছিলাম। ওখানকার গৃহস্থরা আমাদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এবার বৃষ্টির কারণে প্রথম ১০ দিন কোনো কাজই করতে পারিনি। তবে পরবর্তী ১৭ দিন দিনরাত পরিশ্রম করে কাজ করেছি। পারিশ্রমিক হিসেবে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ মন ধান পেয়েছি। এখন এই কষ্টার্জিত ধান গাড়িতে করে নিয়ে আনন্দের সাথে বাড়ি ফিরছি। এই ধান দিয়ে বর্ষাকালে আমাদের পরিবার অন্তত ভালো ভাবে চলে যাবে।
বিশ্রাম শেষে চালকেরা তাদের ঘোড়ার গাড়ির বহর নিয়ে আবারও নিজ গ্রাম ঘোষপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এই বাহনটি যে এখনও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, এই দৃশ্য যেন তারই প্রমাণ দিল।

















